ইসলামি অর্থনীতি বলতে কী বুঝায়? ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর। অথবা, ইসলামি অর্থব্যবস্থা বলতে কী বুঝায়? ইসলামি অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যাবলি লেখ।
ইসলামি অর্থনীতি: ইসলাম ধর্ম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। ইসলামি জীবন বিধানে মানবজীবনের সমস্যাবলির সামগ্রিক সমাধান নিহিত রয়েছে। ইসলামের মৌলিক নিয়মকানুনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ইসলামি অর্থব্যবস্থা বলা হয়। এ ব্যবস্থায় আল্লাহ তায়ালার বিধিবিধানের ভিত্তিতে জীবিকা অর্জন ও অর্থনৈতিক কার্যাবলি পরিচালিত হয়।
ইসলামি অর্থব্যবস্থা মানবজীবনের কোনো বিচ্ছিন্ন আলোচনা নয়। এটা মানবজীবনের সামাজিক, ধর্মীয়, নৈতিক অর্থাৎ সামগ্রিক ক্ষেত্রের সাথে সম্পৃক্ত। ইসলামি অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য: ইসলামি অর্থব্যবস্থা পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দেয়। এ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপঃ
- মানবজীবনের সামগ্রিক দিকের সাথে সম্পৃক্তঃ ইসলামি অর্থব্যবস্থা মানবজীবনের কোনো বিচ্ছিন্ন বা আংশিক ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করে না। মানবজীবনের সমগ্র ক্ষেত্র এর আওতাভুক্ত। আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষসহ সব দ্রব্যসামগ্রী ও বস্তুসম্পদ সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ আল্লাহর একত্ব ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ ব্যবহার করবে, ইসলামি অর্থনীতি এ কথাই বলে।
- মানুষের অধিকার ও দায়িত্বে বিরোধ বা বৈষম্য নেই: ইসলামি অর্থব্যবস্থায় সমাজের ব্যক্তি ও সমষ্টির অধিকার, কর্তব্য ও দায়িত্বে কোনরূপ বিরোধ বা বৈষম্য নেই। কারণ এ ব্যবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তিকে মর্যাদা এবং জীবনধারণের অধিকার দেয়া হয়। প্রত্যেকে যেমন তার পূর্ণ অধিকার ভোগ করে তেমনি সে সামাজিক কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ হয়। এ ব্যবস্থায় পরিপূর্ণ সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
- মানবকল্যাণে সব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারঃ ইসলামি অর্থব্যবস্থায় দেশের সমগ্র প্রাকৃতি ও মানবিক সম্পদকে মানুষের আয়ত্তাধীন এবং তার কল্যাণে ব্যবহারের কথা বলা হয়। এ ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক প্রচেষ্টা দ্বারা সম্পদের কল্যাণমূলক ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
- বৈষয়িক উন্নতির সাথে নৈতিক উন্নতির সমন্বয় সাধনঃ ইসলামি অর্থব্যবস্থায় মানুষের বৈষয়িক উন্নতির সাথে তার নৈতিক উন্নতির উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। কারণ নৈতিক উন্নতি ছাড়া বৈষয়িক উন্নতি সমাজে দুর্নীতি ও পরিণামে অনুন্নতি সৃষ্টি করতে পারে।
- সম্পদের আমানতদারি মালিকানা: ইসলামি অর্থব্যবস্থায় মানুষ স্রষ্টার সবরকম দান থেকে পার্থিব সম্পদ উৎপাদন ও বিতরণ করতে পারে। এ ব্যবস্থায় সম্পদ ও সম্পত্তিতে মানুষের নিরঙ্কুশ মালিকানা স্বীকৃত নয়। সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষ নিজেকে কেবলমাত্র স্রষ্টার আমানতদার হিসেবে গণ্য করে। এজন্যই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাফল্য মানুষের চরিত্রে দুর্নীতি ও লোভ সৃষ্টি করতে পারে না।
- শ্রমের মর্যাদাঃ ইসলামি অর্থব্যবস্থায় শ্রমের উচ্চ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ইসলামি সমাজে শ্রম ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক অধিকার স্বীকৃত নয়। এ সমাজে নারীকেও শ্রমের বিনিময়ে ভোগের অধিকার দেয়া হয়েছে। রাসূলে করীম (স) শ্রমকে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো কাজই নীচু কাজ নয়। আল-হাদিসে উল্লেখ আছে, সেরা উপার্জন হচ্ছে কর্মীর হাতে (শ্রমের) উপার্জন যখন সে আন্তরিকতার সাথে কাজ করে।
- অপচয় ও বিলাসের সমর্থন নেই: ইসলামি অর্থব্যবস্থায় শরিয়াহ বিধিবিধান দ্বারা ভোগকর্ম নিয়ন্ত্রিত। এজন্য এখানে অপচয় ও বিলাসকে সমর্থন করা হয় না। অর্জিত আয়ের ব্যয় ও বণ্টন অবশ্যই হতে হবে উৎপাদনমুখী। অর্জিত উদ্বৃত্ত আয়-ব্যয় করতে হবে আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে।
পরিশেষে বলা যায় যে, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ হলো ইসলামি অর্থনীতির মূল উৎস। সুতরাং ইসলামি অর্থনীতিতে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত পথেই যাবতীয় অর্থনেতিক কার্যাবলি পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।









