রাজনীতির ক্ষেত্রে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
নারীবাদের প্রবক্তাগণ একটি সম্পূর্ণ আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতিকে বিচারবিশ্লেষণ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে পূর্বে প্রচলিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনার ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
প্রথমত, নারীবাদ হল এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা লিঙ্গা কর্তৃত্ব বা লিঙ্গ বৈষম্যের অবসান চায়।
দ্বিতীয়ত, নারীবাদ চায় সমাজে লিঙ্গগত বৈষম্য দূর করে এমন এক সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠন করতে যেখানে নারীরা ভোগ করবে সমান অধিকার এবং সমান সুযোগসুবিধা।
তৃতীয়ত, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মূলত একটি প্রতিবাদী আন্দোলন। নারী সম্পর্কিত প্রচলিত ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি-যা নারীকে হীন করে ও লাঞ্ছনা দেয়, এই আন্দোলন সেগুলিকে বর্জন করার কথা বলে। নারী যেখানে বর্জিত ও উপেক্ষিত সেইসব বিষয়গুলিকেও বর্জন করার জন্য এই আন্দোলন সোচ্চার।
চতুর্থত, নারীবাদ অনুসারে যে রাজনীতি নারীর অস্তিত্বকে ও তার ক্ষমতায়নের পরিধিকে বিকৃত ও সীমিত করে তার বিলোপ করা প্রয়োজন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের ওপর পুরুষদের নানারকম কর্তৃত্ব আরোপ, নির্যাতন ও শোষণের বিরুদ্ধে নারীবাদ হল এক প্রকারের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। এক্ষেত্রে নারীকে দেখা হয়েছে একটি নিপীড়িত শ্রেণি হিসেবে।
পঞ্চমত, নারীবাদ হল এমন একটি মতাদর্শ যেখানে নারীসমাজের পরিবর্তনের ধারা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কেবলমাত্র নারীদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা প্রভৃতি প্রদান সম্পর্কিত বিচার-বিশ্লেষণই এই দৃষ্টিতে আলোচিত হয় না-এই দৃষ্টিভঙ্গি চায় নারীদের সামাজিক বৈষম্যগুলিকেও পরিবর্তন করতে।
নারীবাদ একটি বৌদ্ধিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় 1792 খ্রিস্টাব্দে মেরি উলস্টোনক্রাফ্ট-এর লেখা ‘A vindication of the Rights of woman’ নামক বইটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য, নারীদের সমানাধিকার প্রদানের দাবি প্রভৃতি তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। এরপর থেকে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে যেসব আলোচনা ও আন্দোলন লক্ষ করা যায় সেগুলিকে কয়েকটি তরঙ্গ (wave) হিসেবে ভাগ করে আলোচনা করা হয়।
প্রথম তরঙ্গ (First wave)
ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অষ্টাদশ শতকে নারীবাদ সম্পর্কিত আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। মার্কিন নারীবাদী চিন্তাবিদ মার্গারেট ফুলারের ‘Woman in the Nineteenth Century’ নামক গন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সাড়া পড়ে যায়।
দ্বিতীয় তরঙ্গ (Second wave)
সিমন ডি বোভোয়া (Simone de Beauvoir) রচিত ‘The Second Sex’ প্রকাশিত হবার পর নারীবাদী চিন্তায় এক নতুন দিগন্ত লক্ষ করা যায়। এইসময় প্রকাশিত বিভিন্ন ধরনের সিনেমা, দূরদর্শন এমনকী সাহিত্যেও নারীদের একজন সফল জননী তথা একজন সফল স্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তৃতীয় তরঙ্গ (Third wave)
1990-এর দশকের শুরুতে তৃতীয় তরঙ্গের সূত্রপাত। এই তরঙ্গে নারীদের বিভিন্ন সমস্যাকে তুলে ধরা হয়। তা ছাড়া এই তরঙ্গ মনে করে যে নারী যেহেতু সমধমীয় বর্গ নয়, সেহেতু বর্গ, ধর্ম, সংস্কৃতি, শ্রেণি, রাষ্ট্র প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রেই বিভিন্ন নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতিত।
চতুর্থ তরঙ্গ (Fourth wave)
নারীবাদের চতুর্থ তরঙ্গের সূত্রপাত ঘটে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। এই নারীবাদের মূল বৈশিষ্ট্য হল Website, Social networking site প্রভৃতির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ও বিভিন্ন সংস্কৃতির নারীদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে তাদের সমস্যা সম্পর্কে যেমন জানতে পারছে, তেমনই সমস্যাসমাধানের সূত্রও নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে।
রাজনৈতিক চিন্তাধারায় তাই নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির যে বিষয়গুলি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে তা হল-
প্রথমত, নারীকে মানবতার (humanity) একটি অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। এক্ষেতে পুরুষের সঙ্গে নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে অভিন্নতার ধারণাটি স্বীকার করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, নারী ও পুরষের মধ্যে যে স্বাভাবিক জৈবিক পার্থক্য বিদ্যমান, সেই অনুযায়ী পুরষের থেকে নারীকে নিকৃষ্টতর হিসেবে সাবেকি চিন্তকরা মনে করেছেন। নারীবাদীরা সাবেকি চিন্তাধারার তীব্র নিন্দা করেছেন।
তৃতীয়ত, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী ও পুরুষের ভিন্নতা ও অভিন্নতা থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ক্ষমতার ফলাফল ও সংগঠিত বিষয়কে। এক্ষেত্রে নারীবাদী চিন্তকগণ এমন একটি রণকৌশল গঠন করতে চেয়েছেন যার মধ্য দিয়ে সাবেকি চিন্তাধারা অনুসারে লিঙ্গগত কুমোচ্চ ব্যবস্থাকে দুর্বল করা যায় ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।
পরিশেষে, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী ও পুরুষের জৈবিক পার্থক্যকে অস্বীকার করা হয়নি ঠিকই, কিন্তু একে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করাও হয়নি। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে নারীর সংগ্রামের ক্ষেত্রে পুরুষরাও সাথি হতে পারে। এক্ষেত্রে নারীকে দেখা হয়েছে এক নিপীড়িত মানবগোষ্ঠী হিসেবে।







