বাংলাদেশের ভূমিরূপ প্রধানত কয় প্রকার?
2. প্লাইস্টোসিন কালের সোপান অঞ্চল বা চত্বরভূমি (Pleistocene Terraces)
3. সাম্প্রতিক কালের প্লাবন সমভূমি (Recent Floodplains)
মজার ব্যাপার হলো, এই তিনটি ভাগের মধ্যে সাম্প্রতিক কালের প্লাবন সমভূমির পরিমাণই সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮০%। বাকি ২০% এলাকার মধ্যে প্রায় ১২% হলো টারশিয়ারি যুগের পাহাড় আর প্রায় ৮% হলো প্লাইস্টোসিন কালের সোপান অঞ্চল।
চলুন, এবার এই তিনটি ভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ (Tertiary Hills)
এই পাহাড়গুলো কোথায় দেখা যায়?
- দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের কিছু অংশ)
- উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার কিছু অংশ)
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ
- তাজিংডং (বিজয়): উচ্চতা প্রায় ১২৩১ মিটার (বান্দরবান)।
- কেওক্রাডং: উচ্চতা প্রায় ৯৮৬ মিটার (বান্দরবান)।
- অন্যান্য উঁচু চূড়া যেমন মোদক মুয়াল, পিরামিড, লুলাইং ইত্যাদিও এখানেই রয়েছে।
উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ
- চিকনাগুল টিলা
- খাসিয়া ও জয়ন্তিয়া টিলা
পাহাড়ি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য
- তুলনামূলকভাবে বেশি উঁচু ভূমি।
- মাটি ও পাথর অপেক্ষাকৃত পুরোনো।
- ঢালু ভূমি, তাই বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যায়।
- নদীগুলো খরস্রোতা।
- ঘন বনভূমি (যদিও বর্তমানে অনেক কমে গেছে)।
- ভূমিধসের ঝুঁকি থাকে।
পাহাড়ি অঞ্চলের গুরুত্ব
- বনজ সম্পদ: এখানকার বন থেকে মূল্যবান কাঠ ও অন্যান্য সম্পদ পাওয়া যায়।
- কৃষি: পাহাড়ের ঢালে জুম চাষ এবং চা, রাবার, আনারস ইত্যাদি ফলের চাষ হয়।
- পর্যটন: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা।
- প্রাণিবৈচিত্র্য: বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
- নদীর উৎস: অনেক ছোট নদীর উৎস এই পাহাড়ি এলাকা।
২. প্লাইস্টোসিন কালের সোপান অঞ্চল বা চত্বরভূমি (Pleistocene Terraces)
এই সোপান অঞ্চল কোথায় দেখা যায়?
- বরেন্দ্রভূমি: দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে (রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর ও দিনাজপুরের অংশবিশেষ)।
- মধুপুর ও ভাওয়াল গড়: দেশের মধ্যাঞ্চলে (ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকার অংশবিশেষ)।
- লালমাই পাহাড়: কুমিল্লা শহরের কাছে অবস্থিত।
বরেন্দ্রভূমি
মধুপুর ও ভাওয়াল গড়
লালমাই পাহাড়
সোপান অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য
- আশেপাশের প্লাবন সমভূমি থেকে কিছুটা উঁচু (৬-৩০ মিটার)।
- মাটি লালচে বা ধূসর রঙের এবং কাঁকরময়।
- তুলনামূলকভাবে কম উর্বর (তবে সেচ দিলে ভালো ফসল হয়)।
- সাধারণত বন্যার পানি ওঠে না।
- অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক বনভূমি (যেমন শালবন) দেখা যায়।
সোপান অঞ্চলের গুরুত্ব
- কৃষি: সেচের মাধ্যমে ধান এবং অন্যান্য ফসল (যেমন আম, কাঁঠাল, আনারস) চাষ করা হয়।
- বনজ সম্পদ: মধুপুর ও ভাওয়াল গড়ের শালবন গুরুত্বপূর্ণ।
- যোগাযোগ: উঁচু হওয়ায় রাস্তাঘাট তৈরি ও বসতি স্থাপনের জন্য সুবিধাজনক।
- প্রত্নতত্ত্ব: লালমাই পাহাড়ের মতো কিছু এলাকায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
৩. সাম্প্রতিক কালের প্লাবন সমভূমি (Recent Floodplains)
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অংশ কোনটি?
প্লাবন সমভূমির গঠন ও বৈশিষ্ট্য
- গঠন: নদীর বয়ে আনা পলি (বালি, পলি ও কাদা) জমে এই সমভূমি তৈরি হয়েছে।
- উচ্চতা: এই এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি উঁচু নয়, বেশিরভাগ জায়গার উচ্চতা ৯ মিটারের কম। তবে উত্তর দিকের কিছু এলাকার উচ্চতা কিছুটা বেশি (প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত)।
- মাটি: এখানকার মাটি খুব উর্বর, যা কৃষিকাজের জন্য খুবই উপযোগী।
- বন্যা: বর্ষাকালে বা বন্যায় এই এলাকার বেশিরভাগ অংশই পানিতে ডুবে যায়।
- নদীনালা: পুরো এলাকা জুড়ে অসংখ্য নদী, খাল, বিল ছড়িয়ে আছে।
- ভূমিকম্প: কিছু কিছু এলাকা সামান্য ভূমিকম্প প্রবণ।
প্লাবন সমভূমির প্রকারভেদ
2. নদী বিধৌত সমভূমি (River Floodplains): প্রধান প্রধান নদী (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ইত্যাদি) এবং তাদের শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে গঠিত সমভূমি। এটাই সবচেয়ে বড় অংশ।
3. বদ্বীপ অঞ্চল (Deltaic Plain): নদীর মোহনার কাছে ব-দ্বীপ আকারে গঠিত সমভূমি। একে আবার সক্রিয়, পরিণত ও মৃত বদ্বীপ অঞ্চলে ভাগ করা যায়। সুন্দরবন এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
4. উপকূলীয় বা জোয়ার-ভাটার সমভূমি (Coastal Tidal Plain): দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্র উপকূল বরাবর যে সমভূমি, যেখানে জোয়ার-ভাটার প্রভাব দেখা যায়।
5. হাওর অঞ্চল (Haor Basin): উত্তর-পূর্ব দিকে সিলেট অঞ্চলের নিচু এলাকা, যা বর্ষাকালে বিশাল জলাভূমিতে পরিণত হয়।
প্লাবন সমভূমির গুরুত্ব
- কৃষি: উর্বর মাটির কারণে এটি বাংলাদেশের প্রধান কৃষি এলাকা। ধান, পাট, গম, ডাল, তৈলবীজসহ প্রায় সব ধরনের ফসল এখানে উৎপন্ন হয়। একে ‘বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার’ বলা হয়।
- জনবসতি: সমতল ও উর্বর হওয়ায় দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখানেই বাস করে।
- যোগাযোগ: নদীগুলো প্রাকৃতিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এছাড়া সড়ক ও রেলপথেরও বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে।
- মৎস্য সম্পদ: অসংখ্য নদী, খাল, বিল, হাওর থাকায় এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়।
- অর্থনীতি: কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও ব্যবসার মূল কেন্দ্র এই সমভূমি অঞ্চল।
ভূমিরূপের প্রভাব: আমাদের জীবনে ভূমিরূপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
* বসতি স্থাপন: মানুষ সাধারণত বসবাসের জন্য সমতল ও বন্যা থেকে নিরাপদ উঁচু জায়গা বেছে নেয়। তাই প্লাবন সমভূমির উঁচু অংশে এবং সোপান অঞ্চলে জনবসতি বেশি ঘন।
* যোগাযোগ ব্যবস্থা: সমতল এলাকায় সড়ক ও রেলপথ তৈরি করা সহজ। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন ও ব্যয়বহুল। আবার নদীভিত্তিক সমভূমিতে নৌপথ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
* অর্থনীতি: ভূমিরূপ অনুযায়ী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভিন্ন হয়। পাহাড়ে বনজ সম্পদ ও পর্যটন, সমভূমিতে কৃষি ও শিল্প, উপকূলে মৎস্য ও লবণ চাষ প্রধান।
* প্রাকৃতিক দুর্যোগ: পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস, সমতল ও উপকূলীয় এলাকায় বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বেশি থাকে। ভূমিরূপ এই দুর্যোগগুলোর কারণ ও প্রভাবকে প্রভাবিত করে।
* সংস্কৃতি: বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ এমনকি উৎসবও সেখানকার ভূমিরূপ ও প্রকৃতির দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হয়।
উপসংহার (শেষ কথা)
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs)
প্রশ্ন ১: বাংলাদেশের ভূমিরূপ প্রধানত কত প্রকার?
উত্তর: বাংলাদেশের ভূমিরূপকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়: (১) টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ, (২) প্লাইস্টোসিন কালের সোপান অঞ্চল, এবং (৩) সাম্প্রতিক কালের প্লাবন সমভূমি।
প্রশ্ন ২: বাংলাদেশের কোন অঞ্চলের ভূমিরূপ সবচেয়ে উঁচু?
উত্তর: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ সবচেয়ে উঁচু। এখানকার গড় উচ্চতা প্রায় ৬১০ মিটার এবং এখানেই দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলো অবস্থিত।
প্রশ্ন ৩: প্লাবন সমভূমি কীভাবে গঠিত হয়েছে?
উত্তর: নদীগুলো হিমালয় ও অন্যান্য উঁচু অঞ্চল থেকে পলিমাটি (বালি, পলি ও কাদা) বয়ে আনে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই পলি জমা হয়েই বাংলাদেশের বিশাল প্লাবন সমভূমি গঠিত হয়েছে। প্রতি বছর বন্যার সময় নতুন পলি জমা হয়ে এই প্রক্রিয়া এখনও চলছে।
প্রশ্ন ৪: বরেন্দ্রভূমি কোন ধরনের ভূমিরূপের অংশ?
উত্তর: বরেন্দ্রভূমি প্লাইস্টোসিন কালের সোপান অঞ্চলের একটি অংশ। এটি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি উঁচু, লালচে মাটির এলাকা।
প্রশ্ন ৫: বাংলাদেশের মোট কত শতাংশ এলাকা প্লাবন সমভূমি?
উত্তর: বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকাই হলো সাম্প্রতিক কালের প্লাবন সমভূমি। এটিই দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত ভূমিরূপ।








